পদ্মা সেতুর ২৭ নম্বর স্প্যান বসবে আগামীকাল : মাওয়া প্রান্তে সুপার টি গার্ডার স্থাপন শুরু

অর্থনীতি

সকালের বাংলা ডেস্কঃ পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। নানা চ্যালেঞ্জ সত্বেও সেতুর কাজ চলমান রয়েছে এবং স্বপ্নের সিঁড়ি সফলভাবে অতিক্রম করতে চলেছে। তাই এখন স্বপ্ন বাস্তবায়নের খুব কাছে পদ্মা সেতু।
আগামীকাল শনিবার ২৭ নম্বর স্প্যান বসানো হচ্ছে। ‘৫সি’ নম্বর এই স্প্যান বসবে ২৭ ও ২৮ নম্বর খুঁটিতে। পাঁচ নম্বর মডিউলের ‘সি’ স্প্যানটি আজ শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে মাওয়ার ইয়ার্ড থেকে নিয়ে রওনা হয়। সাড়ে ১০টার দিকে এই ভাসমান ক্রেনবাহী জাহাজ স্প্যানটি নিয়ে ২৮ নম্বর খুঁটির কাছে এ্যাংকর করেছে। পজিশনিংসহ অন্যান্য কর্মকান্ড চলছে।
আগামীকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে এই স্প্যানটি বসানোর কাজ শুরু হবে বলে পদ্মা সেতুর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মুরাদ হোসেন জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সবকিছু প্রস্তুত রয়েছে। তাই সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে শনিবার সকালেই বসে যাবে ২৭তম স্প্যান। এদিকে মাওয়া প্রান্তের সংযোগ সেতুর টি গার্ডার স্থাপন শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যে দু’টি খুঁটির মধ্যে এই স্প্যান বসছে তার একটি ২৭ নম্বর খুঁটি। এই খুঁটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে গত ১৬ মার্চ। এরপর কিউরিং করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরই এটি উঠানো হচ্ছে। খুঁটি তৈরীর পর এত অল্প সময়ে স্প্যান উঠানোর ঘটনা এই প্রথম। যেহেতু এই ‘৫সি’ নম্বর স্প্যান রেডি করে একদম জেটির সামনে রাখা ছিল। তাই এটিই আগে স্থাপন করতে হয়েছে।
২৭ নম্বর স্প্যানটি উঠানোর কথা ছিল আগামী ৩১ মার্চ। তবে আগেই সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ায় তিন দিন আগেই এটি উঠানো হচ্ছে। পদ্মা সেতুর মূল ভিত এখন সম্পন্ন। ৪২টি খুঁটির ৪১টি সম্পন্ন এখন। বাকী শুধু এখন ২৬ নম্বর খুঁিট । খুঁিটর সর্বশেষ প্রক্রিয়া ক্যাপ। এই খুঁটির ক্যাপের রড বাঁধাই হয়ে গেছে। এখন শুধু ঢালাই। কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঢালাই সম্পন্ন হয়ে যাবে বলে প্রকৌশলী জানান। এই খুঁটিটি সম্পন্ন করার টার্গেট রয়েছে আগামী ১০ এপ্রিল। তবে এর আগেই সম্পন্ন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে তিনটি স্প্যান বসলেও মার্চে বসছে দু’টি স্প্যান। গত ১০ মার্চ এর পাশের ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারে ‘৫ডি’ নম্বরের ২৬তম স্প্যানটি বসানো হয়। এতে সেতুর ৩৯০০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। ২৭ তম স্প্যান বসে গেলে স্বপ্নের পদ্মাসেতু পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে আর মাত্র বাকী থাকছে ১৪টি স্প্যান। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পদ্মা সেতুতে ৪১টি স্প্যান বসবে। এরই মধ্যে মাওয়ায় পৌছে গেছে ৩৯টি স্প্যান। বাকী রয়েছে মাত্র ‘২ই’ ও ‘২এফ’ নম্বরের দুইটি মাত্র স্প্যান।
চীনে করোনাভাইরাসের কারণে এই দু’টি স্প্যান বসাতে বিলম্ব হচ্ছিল। তৈরী হয়ে যাওয়া এই স্প্যানের বাকী ছিল শুধু পেইন্টিংয়ের কাজ। চীনের উহানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার কারণে এখন এই কাজ চলছে পুরোদমে। তাই আশা করা হচ্ছে, শিঘ্র এই দু’টি স্প্যানও মাওয়ায় এসে পৌঁছবে।
পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের বলেন, এই দুই স্প্যান ২০ এপ্রিলের দিকে মাওয়ার পৌঁছানোর টার্গেট রয়েছে। শিঘ্র স্প্যান দুটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে শীপমেন্ট করা হবে
তিনি জানান, চৈনিক নববর্ষের ছুটিতে চীনে গিয়ে যেসব কর্মীরা আটকে ছিলেন এদের অনেক ফিরে এসে ‘সঙ্গনিরোধ’ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর কাজে যোগ দিয়েছেন। এছাড়াও ওয়েল্ডিংয়ের কাজে ছয়টি রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ৮ মার্চ থেকে ছয়টি রোবট সফলভাবে কাজ করছে। চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (এমবিইসি) নিজস্ব এই রোবটগুলো চীন থেকে নিয়ে আসে।
পদ্মা সেতুর আরেক সুখবর হচ্ছে, মাওয়া প্রান্তের ভায়াডাক্টের (সংযোগ সেতু) টি গার্ডার বসানো শুরু হয়েছে। গত তিনদিন ধরে এই টি গার্ডার স্থাপন হচ্ছে। এপর্যন্ত ৮টি টিগার্ড স্থাপন করা হয়েছে বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। এর আগে জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কে টি গার্ডার স্থাপন করা হয়। এই প্রান্তে টি গার্ডার স্থাপন প্রায় শেষ পর্যায়ে।
২৭তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর ৪ হাজার ৫০ মিটার বা ৪.০৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হবে। এর পূর্বে গত ১০ মার্চ ২৬ তম স্প্যানটি বসানো হয়। পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের জানান, দেশে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক থাকলেও পদ্মা সেতুর কাজ থেমে নেই। শুক্রবার স্প্যানটি ভাসমান ক্রেন ‘তিয়ান-ই’ পিলার দুটির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দেশী-বিদেশী প্রকৌশলীদের সহায়তায় আগামীকাল শনিবার ৩ হাজার ১৪০ টন ওজনের স্প্যানটিকে ৩ হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ‘তিয়ান ই’ ভাসমান ক্রেন সেতুর ২৭ ও ২৮ নম্বর পিলারের উপর বসিয়ে দিবে। প্রথমে ভাসমান ক্রেনটি নোঙর করে পজিশনিং করে ইঞ্চি ইঞ্চি মেপে স্প্যানটিকে তোলা হবে পিলারের উচ্চতায়। তারপর দুই পিলারের বেয়ারিংয়ের ওপর রাখা হবে স্প্যানটিকে। খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আগে থেকেই বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এভাবেই স্প্যানটি বসিয়ে দেয়া হবে পিলারের উপর।
নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আবদুল কাদের আরো জানান, এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি আরও দুটি স্প্যান বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ নিয়ে তাদের প্রস্তুতিও চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে প্রদ্মা সেতু প্রকল্পের দেশীয় শ্রমিকদের বড় একটি অংশ ছুটিতে রয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীও রয়েছে। এখন শ্রমিকরা আগে জোড়া লাগানো স্প্যানে রং করার কাজ করছে। তারা যথেষ্ট সুরক্ষিত হয়েই সেতুর কাজ করছে।
দায়িত্বশীল সূত্রটি জানায়, পদ্মা সেতুতে বসানোর জন্য এখনও পাঁচটি স্প্যান প্রস্তুত আছে। এর মধ্যে দুটিতে রং করার কাজ চলছে। শ্রমিকরা ছুটি থেকে ফিরে এলে এ কাজের গতি আরো বাড়বে।
৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি দ্বিতল হবে, যার ওপর দিয়ে সড়কপথ ও নিচের অংশে থাকবে রেলপথ।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মূলসেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে চীনের ‘সিনো হাইড্রো করপোরেশন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *