নদীর গতিপথ বন্ধ করে রাস্তা নির্মাণ

সারাদেশ
মোঃ বাবুল হোসেন পঞ্চগড়  :
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আউলিয়ার ঘাটে দুটি নদীর মিলন স্থলে নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ বন্ধ করে দুটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। একটি রাস্তায় চলছে মানুষ পারাপার। অন্য রাস্তা দিয়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে পরিবহন চলছে। শুধু বোদা উপজেলাতেই নয়, জানা গেছে করোতোয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে এভাবে নদীর বুকে বালি এবং মাটি ফেলে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, ফলে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। নাব্যতা হারিয়ে প্রায় বিলীন হয়ে যাবার পথে করতোয়া । পরিবেশ কর্মীরা বলছেন এভাবে চলতে থাকলে জেলার প্রধান নদী করোতোয়া অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে।
আউলিয়ার ঘাটে ঐতিহাসিক ঘোড়া মাড়া নদী ও পঞ্চগড়ের প্রধান নদী করোতোয়ার মিলন স্থল। দীর্ঘদিন ধরে বাঁশের সাকো নির্মাণ করে মানুষ পারাপার হয়ে আসছে এই ঘাটে। কিন্তু বর্তমানে বাঁশের সাকোর দুইপাশে নদী ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশেই একটি বালিমহল ঘিরেও নদী বন্ধ করে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ওই ঘাটে পারাপার বাবদ নির্ধারিত টাকাও আদায় করা হচ্ছে। জানা গেছে জেলা পরিষদ থেকে ঐ এলাকার কিছু প্রভাবশালী মহল নদীর ঘাটটি ইজারা নেয়। বালুমহল ইজারা নেয় ওই এলাকার রাজনৈতিক নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যানের ভাই আজাদ জুলফিকার । তারা নদী বন্ধ করে রাস্তা নির্মাণ করে বালুর ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালিত করছে।
জানা গেছে করোতোয়া নদীতে ১৬ টি বালুমহল রয়েছে। এর মধ্যে ৯ টি স্থানে বালুর ইজাদাররা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নদীর গতিপথ বন্ধ করে বালু উত্তোলন করছে। ইজারাদাররা বলছেন তারা জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের একটি অংশের সাথে কথা বলেই নদীর গতিপথ বন্ধ করেছেন। আউলিয়া ঘাটের ইজারাদার মো: তারামিঞা  জানান, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মেম্বার পদে নির্বাচন করবেন । তিনি বলেন, বোদা থানা পুলিশ এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারদের সাথে আলাপ করেই নদী ভরাট করে রাস্তা বানিয়েছেন।
অন্যদিকে মাড়েয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের বর্তমান সদস্য মশিয়ার রহমান জানান বালু মহলে রাস্তা নির্মাণ ও ঘাটের দুই পাশের রাস্তা নির্মাণে তিনি সহযোগিতা দিয়েছেন। কারণ এতে মানুষের উপকার হচ্ছে। তিনি বলেন, নদীর দুইপাশে আমাদের জমি। ভাঙ্গন ধরলে আমাদের জমিতে ভাঙ্গণ ধরবে। এতে কারও কিছু এসে যায়না। বালুমহল ইজারাদার আজাদ জুলফিকার বলেন নদীর কোন ক্ষতি হচ্ছেনা। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন কাজ কাম নাই তো আপনাদের। নদী খননে কতো দুর্নিতী হচ্ছে সেগুলো নিয়ে লেখেন।
স্থানীয় অধিবাসী ও পরিবেশ কর্মীরা বলছেন বালি উত্তোলন ও মানুষ পারাপারের নাম করে নদীর গতিপথ বন্ধ করেছে একটি প্রভাবশালী মহল। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে পারছেন না। ফলে নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলন ও নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর দুই পাড় ভাঙ্গণের কবলে পড়বে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম এলিন জানান, নদী যারা বন্ধ করেছে তারা খুব প্রভাবশালী । বাঁধ দেয়ার ফলে ধীরে ধীরে নদীটি মরে যাবে। তখন তারাই আবার দখল করবে। এই কাজটি তারা দীর্ঘমেয়াদী নদী দখলের পরিকল্পনা করেই করছেন। প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে এমন একটি সংগঠন কারিগরের সভাপতি সরকার হায়দার বলেন, নদীটিতে বাঁধ দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে । ফলে নদী স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে নদীটি একসময় বিলিন হয়ে যাবে। অথবা গতিপথ পরিবর্তন হবে। গতিপথ পরিবর্তন হলে অনেক এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দেবে। তারা ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মতা মো: সলেমান আলী  জানান, নদীর বুকে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে । এমন খবর আমরা পেয়েছি । সরেজমিন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পঞ্চগড়ে ৪৬ টি নদী প্রবাহমান। এজন্য পঞ্চগড়কে নদীর জেলাও বলা হয়ে থাকে। স্থানীয় পরিবেশবাদী ও নদী রক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মী ও বেশ কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন থেকে নদী দখলের বিরুদ্ধে এবং নদীর নাব্যতা ধরে রাখার জন্য আন্দোলন করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *