গ্যাসের অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি-সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান!

ক্রাইম রিপোর্ট

হেলাল শেখঃ করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বাড়ছে আর অভিযান বন্ধ থাকার সুযোগে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বাসা বাড়ি ও হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা গ্যাসবাজি ও অনৈতিক কর্মকান্ডে সরকারের কোটি কোটি টাকা
হরিলুট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে গ্যাসের পাইপ লাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকান্ডে আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। চলমান নিহতের সংখ্যা ১১ জন, এবং অগ্নিকান্ডে দগ্ধ হয়েছেন প্রায় ৫০ জনেরও বেশি। বিশেষ করে জ্বালানি বিভাগ গঠিত অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন সংক্রান্ত টাস্কপোর্সের বৈঠকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এর মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে না। এ জন্য তিতাসসহ অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হয়েছিলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিন্তু এর কোনো পরিকল্পনা আজ পর্যন্ত কাজে আসেনি বলে অনেকেই জানান। টাস্কফোর্সের প্রধান জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবুল মনসুর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমরা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারবো কিন্তু ২৫% অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেও পারেননি। এখন আরও বাড়তে শুরু করেছে অবৈধ সংযোগগুলো। সারাদেশে তিন লাখ ১৭ হাজার ২৭৫টি অবৈধ সংযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা দাবী করেছেন। গত বছর ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই লাখ ৫২ হাজার ৪৪৩টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ সময় ৩৪৪ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস সংযোগের পাইপ লাইন উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তার দাবী-এখনো এ ধরণের ২৬৩ কিলোমিটার পাইপ লাইন রয়ে গেছে, যা দিয়ে অবাধে গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। এখনো ৬৩ হাজারের মতো অবৈধ গ্রাহক রয়ে গেছে। প্রসঙ্গত, ১৭ ডিসেম্বর) টাস্কফোর্সের সভায় কোম্পানিগুলো তাদের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
সাভার ও আশুলিয়াসহ সারাদেশে গ্যাসের বিতরণ পর্যায়ে ছয় ভাগের মতো সিস্টেম লস রয়েছে। গ্যাস যেহেতু পাইপ লাইনে পরিবহন হয়, তাই এতো বেশি পরিমাণ সিস্টেম লস হয়, কিন্তু এটি গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মাত্র ২ভাগ সিস্টেম লস গ্রহণ করে। তাহলে বাকি ৪ ভাগ সিস্টেম লসের কী হবে?। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো এই সিস্টেম লসকে কায়দা করে অন্য গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয় বলে বৈধ গ্রাহকরা ধারণা করছেন। এতে করে সামগ্রিকভাবে গ্যাসের বিলও বেশি আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার এখন দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে প্রতিদিন ৬০০মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করছে। উচ্চ দরে এসব এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানি খরচ তুলতে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু গ্যাস চুরি হওয়ায় সরকারের পাশাপাশি বৈধ সংযোগকারীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। তাই অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওইদিন বৃহস্প্রতিবার এক বৈঠকে গ্যাস বিতরণ কোম্পানি যে তথ্য তুলে ধরেছে তাতে বলা হয়, এখন যা অবৈধ সংযোগ রয়েছে তা নারায়নগঞ্জেই বেশি। অন্যদিকে ফতুল্লা এলাকায় অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করতে গিয়ে প্রায় ৬০০ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। বৈঠকে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে কাজ করতে হয় বলে কর্মকর্তারা জানান। সারা দেশে প্রায় কয়েক লাখ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। সেই সূত্রমতে ঢাকার আশুলিয়ায় সবচেয়ে বেশি।
অনেকবার বলার পরও অবৈধ সংযোগ পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।
আশুলিয়ায় জামগড়া, চিত্রশাইল শাপলা বিল্ডিং এলাকার মোস্তফার বাড়িসহ পুরো এলাকায় তিতাস গ্যাসর অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। গ্যাসের বৈধ সংযোগের সাথে প্রায় এলাকায় অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি। এর কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। বাড়ছে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ও মৃত্যুর সংখ্যা। আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের ইউসুফ মার্কেট, জিরাবো,
পুরাতন আশুলিয়া, জামগড়ার চিত্রশাইল, অন্যদিকে গাজীরচট, শ্রীপুর, ভাদাইল তালতলা এবং সার্দাগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ৭নং রোডে চিত্রশাইল এলাকার মোঃ মোস্তফা তার বাসা বাড়িতে শরিফুল ইসলামের মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি সংযোগ নিয়েছে।
এর পাশে একটি বাড়ির মালিক আলম, পিতা সৈয়দ আহমেদ, একই এলাকায় এরকম প্রায় সকল বাড়িতেই অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সুত্র জানায়, গভীর রাতে মোস্তফার বাড়িতে শরীফ নামের এক দালাল কর্তৃক সংযোগ দেয়।
অবৈধ গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সাভার ও আশুলিয়া থানায় পৃথক প্রায় ৩০টিরও বেশি মামলা করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ৩০টি মামলার আসামীদের মধ্যে এক দুইজন গ্রেফতার হলেও বাকী আসামীরা প্রকাশ্যে চলছে। এর আগে সাভারের হেমায়েতপুরের মোল্লা পাড়ায় বাসা বাড়িতে তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জনের মধ্যে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফরিদ ও সাইফুল ইসলাম নামের ২জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া দগ্ধ হাবিব এর অবশেষে মৃত্যু হয়। জানা যায়, নিহতরা সবাই টাইলস মিস্ত্রি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির উপ- পরিদর্শক (এসআই) মোঃ বাচ্চু মিয়া জানান, ঘটনার দিন বুধবার দিবাগত ভোর রাতে তারা ৩জন গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়, নিহত ফরিদ হোসেনের বাড়ি গোপালগঞ্জ ও সাইফুল ইসলামের বাড়ি কুষ্টিয়া। এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার ট্যানারী পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সাভারের হেমায়েতপুরের মোল্লা পাড়ার মাসুদ
হোসেনের মালিকানাধীন বাড়ির ২য় তলার নীচ তলায় ৩জন টাইলস মিস্ত্রি ভাড়া থাকতেন। গত বুধবার দিবাগত ভোর রাতে তাদের ভাড়া বাসায় নিজ কক্ষে গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুন ধরে দগ্ধ হন তারা। স্থানীয়রা তাদেরকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটি ভর্তি করলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুইজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার
পর থেকে ওই বাড়ির মালিক পলাতক রয়েছে। এ ছাড়া ওই বাড়ির গ্যাস লাইন অবৈধ ছিলো বলে পুলিশ জানায়।
আশুলিয়ার ইয়ারপুরের জমির আলীর ছেলে সিরাজুল ইসলাম ওরফে (সিরাজ) দালাল চক্রের প্রধান। একই এলাকার মোঃ হানিফ, জলিল, ইয়ারপুরের রাজন ভুঁইয়া, তাহের মৃধা, জহির মোল্লা, হাজী মনির, রাসেল, মুসলিম খাঁ, শরিফুল ইসলাম শরিফ, ফরিদ, নুরনবী ও
টঙ্গাবাড়ির সুমন, জামগড়ার চিত্রশাইলের নাজিম উদ্দিন, সোহেল ও সাঈদ মীর, রনি, জনি, সাইফুল, হাসান ও কাঠগড়ার শাহিনসহ ২৫-৩০ জন দালাল ও তাদের শতাধিক সহযোগী, গত ঈদুল ফিতরের ঈদের আগে ও পরে নতুন করে আবার অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। তাদেও এই গ্যাস বাণিজ্যের কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানান সচেতন মহল। তথ্যমতে, বেশিরভাগ বাসা বাড়িতে অতিরিক্ত চুলা ব্যবহার করছে বৈধ গ্রাহকরাও। দেখা যায়, যেখানে-সেখানে গ্যাসের পাইপলাইন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিপদজনক ভাবে এ যেন দেখার কেউ নেই। গ্যাসের সংযোগের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে। সাভার থানায় ৬টি ও আশুলিয়া থানায় ২৪টি মামলা হলেও আসামীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না, অনেকেই আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসে আবারও নতুন করে অবৈধ গ্যাস বাণিজ্য করছে। ১টি মামলায় প্রায় ৪৫থেকে ৪৭ জন আসামি করা হয়, সব মিলিয়ে ৩০টি মামলায় প্রায় দেড় হাজার আসামী। এসব মামলায় কিছু ইউপি সদস্যসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা আসামীর তালিকায় রয়েছেন, বলে পুলিশ জানান।
আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের চিত্রশাইল এলাকার বাসিন্দা পান্না বেগম বলেন, দালালদের ৩বার ৮৫হাজার টাকা দিয়েছি আমি। মাঝে মধ্যে আরও টাকা দাবি করেন তারা, এই চক্রের সাথে পুলিশও জড়িত আছে বলে তিনি দাবি করেন। পান্না বলেন, আশুলিয়ার অনেক বাড়ির মালিক কিছু সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন, এ যেন দেখার কেউ নেই। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি গ্যাসের বৈধ সংযোগ দিতো তাহলে মানুষ আর অবৈধ সংযোগ দরকার হতো না। জানা গেছে, আশুলিয়ার কাঠগড়ায় তিতাস গ্যাসের লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে হাজী আকবরের ১তলা ভবন ধসে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া মাগুড়ার নাজমুল হকের
ছেলে দেড় বছরের শিশু তাছিম নিহত হয়। এ সময়ে নারী ও শিশুসহ আরও ৪ জন আহতের ঘটনা ঘটে। গত ৯ ও ১০ জুলাই ২০২০ইং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও অনলাইন পোর্টাল গণমাধ্যমে দেখা যায়, আশুলিয়ার কাঠগড়া দূর্গাপুর এলাকায় তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১০বছরের ছেলেসহ একই পরিবারের ৩ জন নিহত হয়।
গত ০৮/০৭/২০২০ইং এ ব্যাপারে নিহতের স্বজন আজিজুল বাদী হয়ে একজন ইউপি সদস্যসহ ৭জনের বিরুদ্ধে আশুরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। আশুলিয়ার কাঠগড়ায় এক স্থানে ১০বারের বেশি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আবারও সংযোগ দেয় দালালরা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রায় ২২টি খাতে দুর্নীতি হয় উল্লেখ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শিল্পাঞ্চলের যেখানে-সেখানে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করায় সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ
সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানী এবং পর্যবেক্ষণমূলক এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন দুদকের কমিশনার ড. মোজ্জামেল হক খান। “প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুদকের এই কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, দুদকের এই প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে”। দুদক কমিশনার বলেন,
২০১৭ সাল থেকে দুর্নীতির জনশ্রæতি রয়েছে এমন ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ অপচয়ের দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছে কমিশন। এসব প্রতিষ্ঠানের জনসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা ও সীমাবদ্ধতা, আইনি জটিলতা, সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি ও দুর্নীতির কারণগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করে তা বন্ধের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৫টি প্রতিষ্ঠানিক টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি টিমের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কমিশনার আরও বলেন, এসব টিম অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্নীতির উৎস দেখতে সঠিকভাবে তদন্ত করতে হবে। তিতাস গ্যাস সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমটি তাদের অনুসনন্ধানে তিতাসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা,
বর্তমান কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে যারা ধারণা রাখেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে, পরে তথ্য সংগ্রহ করেন, সেটা পর্যালোচনাও করেন। এ ছাড়া তিতাসের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনসহ ভুক্তভোগী সেবা গ্রহীতাদের বক্তব্য ও পর্যালোচনা করেন টিম। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা ও অডিট প্রতিবেদনও পর্যালোচনার আওতায় আনে তারা। সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে আমাদের এই টিম তিতাসের দুর্নীতির উৎস ও ক্ষেত্র দেখতে হবে, এবং তা প্রতিরোধে সুপারিশমালা প্রতিবেদন আকারে কমিশনে দাখিল করেন।
মোজ্জামেল হক বলেন, তিতাসের এই প্রতিবেদনে ২২টি সম্ভাব্য দুর্নীতির উৎস প্রমান করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-অবৈধ সংযোগ, নতুন সংযোগ অনীহা এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা, অবৈধ লাইন পুনঃসংযোগ, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া, অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ দেয়া, গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা,
বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেওয়া, মিটার টেম্পারিং, অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ, মিটার বাইপাস করে সংযোগ দেওয়া সংক্রান্ত দুর্নীতি, এস্টিমেশনের চেয়ে কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো, ইচ্ছে করে ইভিসি (ইলেকট্রিনিক ভলিউম কারেক্টর) না বসানো। বিশেষ করে এসব দুর্নীতি
প্রতিরোধে কমিশনের প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ উল্লেখ করেছে। কমিশনের এই প্রতিবেদন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজ হবে। এভাবে দুর্নীতি হওয়ার আগেই, তা প্রতিরোধ করা গেলে, মামলা করার প্রয়োজন পড়বে না।
তিনি আরও বলেন, সরকার যে কোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের যে ঘোষণা দিয়েছে, কমিশন সে ঘোষণা বাস্তবায়ন র্নীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক কার্যক্রম সফল করছে এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এ প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুদকের এই কার্যক্রমের প্রশংসা করে
বলেন, দুদকের এই প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে দেখে যথাযত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। তিনি জানান, এই মন্ত্রণালয়ে তা কার্যকরভাবে অনুসরণ গ্যাসের কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
সাভার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিঃ ব্যবস্থাপক (জোবিঅ) প্রকৌশলী আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম গণমাধ্যমকে বলেন, সাভার ও আশুলিয়ায় গ্যাসের বৈধ গ্রাহক সংখ্যা ৫২ হাজার, শিল্প গ্রাহক সংখ্যা ১৫০০।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের অবৈধ সংযোগ ব্যবহারকারী ও দালালদের বিরুদ্ধে সাভার থানায় ৬টি ও আশুলিয়া থানায় পৃথক ২৪টির মতো মামলা করেছেন। অভিযান প্রক্রিয়াধীন আছে এবং জনবল ও অভিযানের খরচের কথা বলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি দাবি করেন, ২০১৬ সাল থেকে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ করেছে সরকার। তিনি আরও বলেন, গ্যাসের বকেয়া বিল কালেকশনে অভিযান চলছে, দ্রুত অভিযান চালানো হবে। বর্তমানে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সারাদেশে কঠোর লকডাউন চলমান, তাই চোরদেরগ্যাস চুরি করা অব্যাহত রয়েছে বলে অনেকেই জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *