সাংবাদিক ও লেখকদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অপপ্রয়োগ বন্ধে পরিবর্তন দরকার

জাতীয়

স্টাফ রিপোর্টার ঃ জাতির বিবেক প্রকৃত সাংবাদিক ও লেখকদেরকে সম্মান করতে হবে। কোনপ্রকার নির্যাতন নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার থাকা একজন লেখকের অকাল মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদে অব্যাহত বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সরকার এখন এই আইনটির অপপ্রয়োগ বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই আইনে কোনো অপরাধের অভিযোগ এলে পুলিশের তদন্তের আগে কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না, বা তার বিরুদ্ধে মামলা নেয়া যাবে না-এমন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার থাকা লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর এই আইনটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিবাদের অংশ হিসেবে গত ১ মার্চ ২০২১ইং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের বাধার মুখে সচিবালয়ে অবস্থান নিয়েছিলো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতা কর্মীরা। বাংলাদেশ সরকার নানা বিতর্কের মধ্যেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এর শুরুতেই গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মিরা যেমন আপত্তি করেছিলেন, পরে এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়েও তাদের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে বলে বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানানো হয়। তাদের উদ্বেগের মূল বিষয় হচ্ছে, ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা, গুজব রটনা বা সরকারের সমালোচনা করা-এমন সব অভিযোগে মামলা হলেই আটক করে রাখা হয়। এই আইনে ৯ মাস ধরে আটক থাকা লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর পর অভিযোগ ওঠেছে যে, ৬ বার আবেদন করেও আদালত থেকে তার জামিন মেলেনি। এমন প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তদন্তের আগে মামলা নেয়া যাবে না, এমন ব্যবস্থা তারা নিচ্ছেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছি যে, সরাসরি মামলা নেয়া হবে না।কোনো অভিযোগ এলে পুলিশ প্রথমে তদন্ত করে দেখবে এবং সঠিকভাবে তদন্ত শেষে তারপর মামলা নেয়া হবে। কিন্তু আইনটি প্রণয়নের পর থেকে কোনো অভিযোগ এলেই পুলিশ মামলা পুলিশ মামলা নিয়েই সাথে সাথেই অভিযুক্তকে আটক করছে-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী বলেছেন, “আগে যাতে আটক না করে, পুলিশ যেন তদন্তের জন্য অপেক্ষা করেন-সেই জায়গায় আসার জন্য আমরা চেষ্টা করছি”। জামিন হওয়া বা না হওয়ার প্রশ্নে মন্ত্রী মিঃ আনিসুল হক বলেছেন, “সাজা যতটা হলে জামিন হবে এবং যতটা হলে জামিন হবে না-ঠিক সেই প্রিন্সিপালটা ফলো করে আমরা বিধান করেছি, সারা পৃথিবীতেই এটা করা হয়। এমনকি এই উপমহাদেশেও। বিষয়টা নিয়ে আমরা অনেক আলাপ আলোচনা করছি।” আইননের অব্যাহত অপপ্রয়োগ অভিযোগের ব্যাপারে আইনমন্ত্রী বলেছেন, তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। “সব আইনই যখন করা হয়, তখন কিন্তু একটা ট্রায়াল বা পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। এখানে যদি কিছু অ্যাবিউজ এবং মিসইউজ হয়, সেটা কি করে বন্ধ করা হবে-সে ব্যাপারে ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি”। মন্ত্রী আনিসুল হক বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সাথেও আলোচনা করার কথা উল্লেখ করেন। “জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অফিসের সাথে আমি আলাপ চালাচ্ছি। সারা বিশ্বের সাথে আমরা এটার তুরনা করছি। মিসইউজ যেগুলি ধরা পড়ছে বা অ্যাবিউজ যেগুলো হচ্ছে, সেগুলোর জন্য একটা চেক অ্যাÐ ব্যালেন্স সিস্টেম কীভাবে ডেভেলপ করা যায়, এই আইনের মধ্যেই কীভাবে সেটা থাকতে পারে-সেই ব্যবস্থা আমরা করছি,” বলেন আইনমন্ত্রী। তিনিমনে করেন, এসব ব্যবস্থা নিতে আইনের সংশোধনের প্রয়োজন নাও হতে পারে এবং বিধির মাধ্যমে সেটা করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই আইনের কারণে গণমাধ্যমের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মত প্রকাশ বা বাক স্বাধীনতা খর্ব করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেছেন, ভিন্নমত যাতে না আসে, সেজন্য সরকার আইনটি করেছিল বলে তিনি মনে করেন। “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটা ভয় ভীতি প্রদর্শন করে একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, আমাদেরই কিন্তু ভয় লাগে কোন কিছু সম্পর্কে একটা কমেন্ট করতে। একটা সেলফ সেন্সরশীপ কিন্তু এসে গেছে সবার মনে। তিনি আরও বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের সমালোচনা যাতে না হয়, এবং একটা ভয় কিন্তু সবার ভেতরে ঢুকে গেছে। তারা চাচ্ছিল যে, ভিন্নমতটা একবারে যাতে না আসে”। মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা বাক স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ মানতে রাজি নন আইনমন্ত্রী ও সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও। কিন্তু বিতর্কিত এই আইনকে সরকার বা দল কেন প্রয়োজন মনে করছে-এই প্রশ্নও অনেকেই তুলেছেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সিনিয়র মন্ত্রী ডঃ আব্দল রাজ্জাক বলেছেন, বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তাদের সরকার এবং দলের উচ্চ পর্যায়ে তারা আলোচনা করেছেন। তবে ডিজিটাল দুনিয়া নানা অপরাধের প্রেক্ষাপটে আইনটির প্রয়োজন আছে বলেই তাদের দল এবং সরকার মনে করছে। ডাঃ রাজ্জাক আরও বলেন, “আইনের সমস্যা হলো যে, আইনের অপব্যবহার হচ্ছে কীনা-সেটা আমরা অবশ্যই পর্যালোচনা করছি। এটা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হচ্ছে। তারপরও এর সাথে এটাও আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে যে, প্রযুক্তিগত এই সুযোগ বা সুবিধাটাকে আমরা অপব্যবহার করছি কিনা-এবং দেশের ও শান্তি আমরা বিঘিœত করছি কিনা-এটাও আমাদের দেখতে হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার যদি দ্রæত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আইনটি নিয়ে বিতর্ক বা সমালোচনার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তিও উপর দেশে ও বিদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সিনিয়র সাইফুল ইসলাম জয় (হেলাল শেখ) বলেন, আমি সরকারের সাথে একমত প্রকাশ করছি। কিন্তু আমি জানি বাংলাদেশে একটিমাত্র ডিজিটাল বিচারিক আদালত ঢাকায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করতে গিয়ে সিনিয়র আইনজীবী রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে অনেক কিছু জেনেছি আমি, টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না, আবার অনেকেই টাকা দিয়েও সহজভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে সরকার কি করবে, শীর্ষ পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পেয়ে দুর্নীতি করছেন, তাদেরকে আগে আইনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। যাদের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সরকারের বদনাম হয় তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *