আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিককে গণধর্ষণ-৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা, আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

ক্রাইম রিপোর্ট

হেলাল শেখঃ ঢাকার প্রধান শিল্পা ল আশুলিয়ার জামগড়ার উত্তর বেরণ এইচ পি টাওয়ার ইয়াগী বাংলাদেশ গার্মেন্টস লিমিটেড এর ৫ম তলায় এক নারী পোশাক শ্রমিক (১৫) কে গণধর্ষণের অভিযোগে ৩ কর্মকর্তাসহ ৭জনের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা হয়। জাহাঙ্গীর আলম নামের অ্যাডমিন অফিসার একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও বাকি আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে বলে শ্রমিকরা জানায়।
গতকাল ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানায়,গত মঙ্গলবার (২৮ ডিসেম্বর ২০২১ইং) গণধর্ষণের ঘটনায় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে মিছিল মিটিং ও প্রতিবাদ করেন উক্ত কারখানার নারী পুরুষ কয়েক হাজার শ্রমিক। এ ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে কর্মরিতি চালিয়ে রাস্তায় নেমে যায় শত শত শ্রমিক। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জরিত যারা, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার থেকে ভিকটিমকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল কারখানার কর্মকর্তারা, এমনই অভিযোগ করেন ভিকটিম। ভিকটিম জানায়, ঘুমের ওষুধ পুষ করে তাকে তিনজন গণধর্ষণ করেছে। মেয়েটির অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে প্রথমে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলে সেখান থেকে ফেরত দেওয়া হয় পুলিশ কেস বলে। এরপর ঘটনাস্থলে সকাল থেকে রাত্রী পর্যন্ত তাকে উক্ত কারখানায় রেখে রাত ৮টার পর তাকে আশুলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে পরের দিন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় বলে পুলিশ জানায়। এ দিকে অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেন যে, এ মামলার কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করেননি।
এর আগে আশুলিয়ার জামগড়ার রূপায়ন ১নং গেইট, রবিউল সরদারের বাড়ির ভাড়াটিয়া, পাবনার সাঁথিয়ার আবু হানিফ ওরফে নাজমুল এর মেয়ে মাহফুজা আক্তার নাজমা (১৬) কে গণধর্ষণের ঘটনায় আশুলিয়া থানা মামলা না নেওয়ায় সে ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেন। এরপর পুলিশ মামলা রুজু করে। নাজমাকে গণধর্ষণ করিয়া হত্যা ও সহায়তা করার অপরাধে আশুলিয়া থানায় মামলা করার পর মোঃ আব্দুর রহিম (২৬), ১নং আসামীকে জনতা কর্তৃক আটক করে থানা পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এরপর এ মামলার ২নং আসামী ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার বিপিনগর গ্রামের আব্দুল লতিফ এর ছেলে মোঃ রিপন (৩৫), সাভারের বিরুলিয়া এলাকার একটি বাগান থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে সাভার মডেল থানা পুলিশ। এরপর মামলার ৩নং আসামীকে আটক করতে র‌্যাব। র‌্যাব-১ এর বিশেষ একটি দল ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল টেকিংয়ের মাধ্যমে ছায়া তদন্ত করে ফেনী জেলার সোনাগাজী আকিলপুরের মোঃ ইব্রাহিম খলিল শিপন (৩০) কে গ্রেফতার করে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করে।
গত ৫জানুয়ারি ২০১৯ইং ভিকটিম মাহফুজা আক্তার নাজমা (১৬), ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর (৬ জানুয়ারি ২০১৯ইং) নাজমা নিজে বাদী হয়ে প্রথমে আশুলিয়া থানায় মামলা করার জন্য একটি অভিযোগ দায়ের করেন। বিবরণঃ নাজমা জানায়, জামগড়া রূপায়ন ১নং গেইট, রবিউল সরদারের বাড়ীতে মা বাবাসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভাড়া থেকে জামগড়া ইয়ার্গী বাংলাদেশ লিঃ পোশাক কারখানায় সুইং অপরেটার হিসাবে চাকুরি করতেন। নাজমার সম্পর্কে চাচা রহিম ও রিপন ও শিপনসহ তারা বিভিন্ন পদে এক সাথে কাজ করতেন একই পোশাক কারখানায়। প্রতিদিনের ন্যায় গত ০৫/০১/২০১৯ইং তারিখ সন্ধ্যা ৭টায় অফিস ছুটির পর চাচা আব্দুর রহিম (২৬) সহ আমি পায়ে হাটিয়া বাসায় যাওয়ার পথে আমাদের ফ্যাক্টরীর প্রায় ২০০গজ দুরে গলির রাস্তায় পৌছার পর অপরিচিত আরও ২জন বিবাদীর সহায়তায় ১নং বিবাদী রিপন ও শিপন আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার পরিহিত কাপড় খুলিয়া আমাকে তারা ধর্ষণ করে। এ ঘটনার সাথে ৫জন জড়িত বলে সে বেঁচে থাকা অবস্থায় জানায়। এক পর্যায়ে রাত ১২টার দিকে উক্ত বিবাদী রিপন, শিপনসহ ৫ জন ব্যক্তি নাজমাকে বাসায় পৌছাইয়া দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর সকালে থানায় গিয়ে মামলা করার জন্য অভিযোগ করলে পুলিশ মামলা না নেওয়ায় আর বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় লোকলজ্জায় নাজমা ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করেন। এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবী-নাজমাকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করার পর অসুস্থ্য হয়ে স্থানীয় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানায় মামলা নং ১০/ তারিখঃ ০৭/০১/২০১৯ইং। ধারা: ৯(৩)/৩০, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনী ২০০৩: ধর্ষণ করিয়া হত্যা ও সহায়তা করার অপরাধ।
এ ব্যাপারে নাজমার বাবা আবু হানিফ জানান, এ মামলার আসামী রহিম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী আছে, কিছুদিন আগে আদালত থেকে জামিনে আসছে এ মামলার ৩নং আসামী ইব্রাহিম খলিল শিপন (৩০) যিনি ইয়াগী বাংলাদেশ গার্মেন্টস লিমিটেড এর একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মামলার ৩জন আসামীর তথ্য পাওয়া গেলেও অন্য আরও দুইজন ব্যক্তি জড়িত রয়েছে, তাদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। নাজমা’র বয়স (১৬), ২বছর সুইং অপরেটার হিসেবে চাকুরি করেন। কাজ শিখে সুইং অপারেটার হতে আরও এক বছর সময় লাগছে। শিশু শ্রম আইনে পোশাক কারখানায় ১৮ বছরের কম কোনো ব্যক্তিই চাকুরি করতে পারবেন না এমন নিয়ম রয়েছে। উক্ত ঘটনার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা আবার তদন্ত করলে হয়ত কেচু খুঁজতে গিয়ে সাপের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে বলে শ্রমিকরা জানায়।
চলমান পরিস্থিতি তদন্ত করতে আসেন ঢাকা শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মামুন ও আশুলিয়া থানা পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা’র অফিসার। এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সামিউল বলেন, আশুলিয়া থানার জামগড়া ইয়াগী বাংলাদেশ লিমিটেড পোশাক কারখানার ৫ম তলায় যে মেয়েটি ধর্ষণের অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে, জাহাঙ্গীর নামের একজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। র‌্যাব জানায়, উক্ত পোশাক কারখানার ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে ৫ম তলার কারখানার পিএম মোঃ ইমন এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে বলে কারখানার শ্রমিকরা জানায়।
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক ওসি (ইন্টেলিজেন্ট) জামাল শিকদার গণমাধ্যমকে বলেন, একটি পোশাক কারখানার নারী শ্রমিক গণধর্ষণের ঘটনায় ওইদিন মঙ্গলবার রাতেই মামলা হয়, জাহাঙ্গীর আলম নামের একজনকে আটক করে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই নারীকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, এরপর তার স্বাস্থ্য পরিক্ষা করা হয়েছে। উক্ত মামলার আসামীদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *