দেশের বিপুলসংখ্যক ডেথ রেফারেন্স ও অন্যান্য মামলার জটিলতা!

সারাদেশ

হেলাল শেখঃ দেশের উচ্চ আদালতে বিপুলসংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা দীর্ঘদিনেও নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, বরং বিভিন্ন ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ফলে বিচারপ্রার্থী আসামীরাও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। সেই সাথে অন্যান্য মামলারও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
সূত্র জানা গেছে, মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত আসামীদের মামলার বিচার শেষ করতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে, বিশেষ করে করোনার কারণে আদালত বন্ধ থাকায় আরও বেশি সমস্যা হয়েছে। জানা গেছে, আসামিদের বেশিরভাগই কনডেম সেলে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। তুলনামূলক ভাবে উচ্চ আদালতে বর্তমানে ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ৮শতাধিক মামলা। ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রায় ২ হাজারের বেশি আসামী বছরের পর বছর ধরে কনডেম সেলে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির আশায় দিনের পর দিন প্রহর গুনছেন বিচারপ্রার্থী ও আসামীরা। আদালত এবং আইন পেশা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। অনেক সংবাদপত্রে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
সূত্র মতে, উচ্চ আদালতে বিগত ২০১০ইং সালে ডেথ রেফারেন্স মামলা ছিলো ৫৮৫টি। তার মধ্যে মাত্র ৪৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে, বিচারাধীন রয়েছে ৫৪২টি। ২০১১ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে ৬০৯টিতে দাঁড়ায় আর নিষ্পত্তি হয় ৭৪টি। ২০১২ সালে মামলা ছিলো ৫৯৫টি আর নিষ্পত্তি হয় ১৪৫টি। ২০১৩ সালে ৫১৩টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১১১টি। ২০১৪ সালে ৪৯৮টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৩৫টি। ২০১৫ সালে ৪৭৭টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৫৮টি। ২০১৬ সালে মামলা ছিলো ৫৮০টি, নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৫টি। ২০১৭ সালে মামলা ছিলো ৭০৬টি, নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৬৬টি। ২০১৮ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১১টিতে কিন্তু নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৮৩টি। বিগত ২০১৯ইং সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৭২১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ২০২২ সাল এখন পর্যন্ত ডেথ রেফারেন্স মামলা বেড়েই চলেছে এবং অন্যান্য মামলার জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি-দ্রুত এই জটিলতার সমাধান হবে।
সূত্র জানায়, নিম্ন আদালতে বিগত ২০১৫ ও ২০১৬ সালে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি বর্তমানে হাইকোর্টে চলছে, ২০২২ সালেও চলমান। একই সঙ্গে যে সমস্ত মামলার পেপারবুক তৈরি হয়েছে সেগুলোর শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। বিচারের এ সমস্ত মামলায় হাইকোর্ট যদি কোন আসামীর মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে তাহলে মামলার চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত আসামিদের কমপক্ষে ১৬-১৮ বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। অবশ্য এ্যাটির্নি জেনারেল অফিস থেকে বলছেন, করোনার প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গেই আদালতগুলোতে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি পুরোদমে শুরু হয়েছে, যা বর্তমানে চলমান।
সূত্র আরও জানায়, এসব মামলার আরেকটি দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে ডেথ রেফারেন্স মামলার পেপারবুক তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যায়। পেপারবুক তৈরির পর হাইকোর্ট শুনানি, তারপর আপিল বিভাগ। এ সমস্ত ধাপ পেরিয়ে আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বিচারে যে সাজা হয়েছে সেই সাজা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আসামীদের জন্য যেমন যন্ত্রণাদায়ক, আবার বাদীপক্ষের জন্যও হতাশাজনক। অনেকেই দাবি করেন, পেপারবুকের পাশাপাশি ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য বে বাড়ানোও প্রয়োজন। তাতে করে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল শুনানি দ্রুত হবে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুবুনালের প্রসিকিউটর তাপস কান্তি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলো দ্রæত শুনানি হওয়া দরকার। বিচারিক আদালতে যাদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় তারা কনডেম সেলে থাকেন। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ডেপুটি এ্যাটির্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বিচারিক আদালতের রায়ের পরে হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগে শুনানি করতে বেশ সময় লাগে। করোনার কারণে বিচার পক্রিয়া স্থগিত ছিলো। অনেকেই বলছেন যে, থানা থেকে নতুন আসামী গ্রেফতার হলে তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের অনেকেই আবার দ্রæত জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন কিন্তু যারা বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাদের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না বলে অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হত্যা মামলা মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আসামী গ্রেফতার হচ্ছে না। আবার আসামী গ্রেফতার হলেও হাজতবাস করছেন তারা কিন্তু বিচার কাজ শেষ না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার জানান। উক্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.