হেলাল শেখঃ ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুরের তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বেজে ওঠা কারখানার ফায়ার অ্যালার্ম শুনে আঁতকে ওঠে মানুষ। ততক্ষণে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে তার ফ্লোরে। এরপর অনেকের সঙ্গে তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়েন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে শুরু হয় তার অনিশ্চিত জীবনের পথচলা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম জয় জানান এই পোশাক কারখানার ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘন আর মানবাধিকার লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরব কেন?তিনি জানান, দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে পেটের দায়ে কাজে ফিরেছেন। তবে কারখানায় কাজ করার মতো শারীরিক ক্ষমতা হারিয়েছেন। অনেক কারখানায় ঘুরেও কাজ না পেয়ে আহত শ্রমিকদের মধ্যে কয়জনকে নিয়ে একটি কারখানা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে সেটা সম্ভব হয়নি।সবিতা বলেন, ‘এরপর অনেক কষ্টে একটা সেলাই মেশিন কিনে বাসায় টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করছি। আমার দিন খুব কষ্টে যাচ্ছে। ভারী কোনও কাজ করতে পারি না। ব্যথা-যন্ত্রণায় প্রতিদিন রাতে কান্না করে ঘুমাই। ঘুম নেই। পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে আছি। এই জীবন থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।’তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর সরকার যে সাহায্য করেছে তা চিকিৎসার পেছনেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা সাহায্য চাই না, ক্ষতিপূরণ চাই। কোনও ধরনের ক্ষতিপূরণ পাইনি। সরকার ও বিজিএমইএ যেন একটা ব্যবস্থা করে দেয়। সরকার আশ্বাস দিয়েছে, এগুলো বাস্তবায়ন করলে তাও একটু বাঁচতে পারবো। যারা মরে গেছে তারাই বেঁচে গেছে। আমরা যারা বেঁচে আছি, ধুঁকে ধুঁকে মরছি। ১৩ বছর চলে গেলো, কিছুই পেলাম না।’সীমা আক্তার নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘কারখানার জায়গাটি ১৩ বছর ধরে এভাবে ফেলে রেখেছে। এটি হয় চালু করুক, না হয় আমাদের থাকার জায়গা করে দিক। আমরা তো কাজ করতে পারছি না। কোনও সহযোগিতা পাইনি। কিছু টাকা পেয়েছি। কিন্তু আর কাজ করতে পারি না। আমরা কী মানুষ না, আমাদের কী বাঁচার অধিকার নাই। আমাদের দেখার কেউ নাই। নতুন সরকারের কাছে আশা এটাই যে, তারা আমাদের দিকে তাকাবে। আমাদের বিচারের দাবি পূরণ করবে। নভেম্বর এলে ডাকাডাকি করে অনেকে। কিন্তু কিছু পাই না। ঘর ভাড়া, দোকানে বাকি দিতে পারি না। ওষুধের টাকা নাই। আগুনে জীবনটাই শেষ হয়ে গেলো।’নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসার দাবি শ্রমিকনেতাদেরআহত হয়ে একদিকে অক্ষম, অন্যদিকে কর্মহীনতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেইসঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিচার চান শ্রমিকনেতারা।বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক নিহতের ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ কিংবা পুনর্বাসন হয়নি। কিছু সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু সঠিক পুনর্বাসন হয়নি। তারা কষ্টে জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসা পাচ্ছেন না। সরকার যাতে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় সে দাবি জানাই।’বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু বেপারী বলেন, ‘মালিকপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটায়। আজ পর্যন্ত মৃতদের স্বজনরা ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত শ্রমিকরা সুচিকিৎসা পাননি। সহযোগিতাও পাননি। এখানে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও আগের সরকার মালিককে নামমাত্র গ্রেফতার করেছিল। তারপর জামিনে মুক্তি পায়। এরপর মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি হয়ে দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়ায়।। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, আগের সরকারের আমলে শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি। এই সরকার যেন তদন্ত করে শ্রমিক হত্যার সঠিক বিচার করে। পাশাপাশি ওই কারখানার যে পরিত্যক্ত জমি রয়েছে সেখানে একটি শ্রমজীবী হাসপাতাল করে সরকারের অর্থায়নে শ্রমিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
